শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ভ্রমণ / জৈন্তাপুরে শাপলার রাজ্যে
০৩/৩০/২০১৭

জৈন্তাপুরে শাপলার রাজ্যে

-

সিলেটের পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে, মেঘালয় রাজ্যের পাদদেশে প্রাকৃতিক ভাবেই তৈরি হয়েছে অজস্র জলাশয়। এমনই এক স্থান জৈন্তাপুর। সীমান্তের গা ঘেঁষা উঁচু পাহাড়ের চুড়ায় মেঘের পানি ঘনীভূত হয়ে গড়িয়ে নেমে আসে এই জৈন্তাপুরে। পানির প্রবাহ এসে থেমেছে ডিবির হাওরে, যার সাথে ইয়াম বিল, হরফকাটা বিল এবং কেন্দ্রি বিল সংযুক্ত। এই সব জলাশয়কে কেন্দ্র করেই জৈন্তাপুরে ঘর বেঁধেছে খাসিয়া সম্প্রদায়ের বহু মানুষ যারা জীবিকা অর্জন করছে কৃষি কাজ এবং বিলের মাছ শিকার করে। এই স্থানীয়দের যত্নেই আজ এইসব জলাশয় লাল-বর্ণের শাপলায় পরিপূর্ণ, কালক্রমে যা হয়ে উঠছে একটি প্রিয় টুরিস্ট গন্তব্য।

হেমন্তকালে শীতের আগমনের সাথে সাথে পুরো হাওর ছেয়ে যায় লাল বর্ণের শাপলায়। স্বচ্ছ পানির উপর রঙ্গিন শাপলাগুলো ঢেউয়ের সাথে ছন্দ মিলিয়ে নেচে চলে। নৌকা দিয়ে বিলের মাঝে ভেসে বেড়ানোর সময় আপনি দেখবেন ঢেউয়ের মাঝে উজ্জ্বল রোদ আর রঙিন শাপলার এক অপূর্ব মিলন। তবে শাপলার আসল রূপ দেখতে হলে আপনাকে বিলে পৌছাতে হবে সূর্য ওঠার আগে। ভোরের প্রথম আলো ফোটার সাথে সাথে শাপলা তার পাপড়ি ছড়িয়ে দেয়। পানির উপর তখন একে একে যেন নতুন কিছু জন্ম নেয় চোখের সামনে। ভোরের কুয়াশা কেটে গেলে পূর্বের সূর্য আলো ছড়িয়ে দেবে বিলের ওপর।

তবে সূর্যের রঙ যেন সম্পূর্ণ আলাদা এই বিলের মাঝে। শাপলার লাল পাপড়ির মধ্য দিয়ে সূর্যের রেখা ছড়িয়ে পড়বে পানির ওপর, এবং আপনি দেখবেন প্রকৃতি কীভাবে রঙ বদলায়। শুধু শাপলা নয়, বিলের সৌন্দর্যকে পরিপূর্ণ করেছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের অজস্র পাহাড় ও জলপ্রবাহ। নৌকায় চড়ে আপনার পাশেই দেখতে পাবেন অসম্ভব সুন্দর সেইসব পাহাড়। তবে আফসোসের ব্যাপার হল এইসব পর্বত ভারত সীমান্তের মধ্যে হওয়ায় সেগুলোকে দূর থেকে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

এবার বলি এই জৈন্তাপুরে শাপলার আগমন কীভাবে। স্থানীয়দের ভাষায় এই বিলে আগে কোন ধরনের শাপলা ছিল না। ত্রিশ বছর আগে সীমান্তের ওপারের খাসিয়া সম্প্রদায়ের কোন এক ব্যাক্তি পূজা-অর্চনার ফুলের চাহিদা মেটাতে বিলে শাপলার বীজ রোপণ করে। কালক্রমে সীমান্তের পাশের এই বিলগুলোতে শাপলা ছড়িয়ে পরেছে। এর ফলে বিলের মাছ এবং জীববৈচির্ত্যের জন্য তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক বাসস্থান এবং ভ্রমনপিপাশুদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন এক গন্তব্য। শুধু তাই নয়, শীতের মাঝে এই বিলগুলোতে ভিড় করে অতিথি পাখিও।

দিনের প্রথমার্ধে আপনি জৈন্তাপুরের হাওর ও বিল ঘুরে দেখে শেষ করতে পারবেন। এর পরে সিএনজি বা অটোরিকশা করে চলে আসতে পারবেন সিলেটের বিখ্যাত লালা খালে, যা জৈন্তাপুর বাজার থেকে বেশ কাছেই অবস্থিত। লালা খাল বিখ্যাত তার অনন্য পানির বর্ণের কারণে। নীল এবং সবুজের মিশ্রণে লালা খালের পানি অন্যসব স্থান থেকে আলাদা। দিনের একেক সময় একেক বর্ণ ধারণ করে লালা খাল। এখানে কোন শাপলা নেই, তবে খালের দুই পাশেই আছে সবুজে আবৃত পাহাড়ের আশ্রয়। ঘন্টা হিসেবে নৌকা ভাড়া করে ঘুরতে হবে লালা খাল, খরচ পরবে ২ হাজার টাকার মতো। সব মিলিয়ে বড় গ্রুপ নিয়ে ভ্রমনের জন্য বেশ ভাল জায়গা।

কীভাবে যাবেন
সিলেট-তামাবিল সড়কের মাঝে জৈন্তাপুর বাজার, যেখানে যেতে হবে বাস, লেগুনা, সিএনজি কিংবা প্রাইভেট গাড়িতে করে। সেই বাজার থেকে সিএনজি করে রওনা দিতে হবে বিলের উদ্দেশ্যে। বাজারের একটু সামনেই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের বিশেষ ক্যাম্প। এরপরে শুরু বিল পর্যন্ত এক কিলোমিটার লম্বা কাঁচা সড়ক। বিলের মধ্যে নৌকা ভাড়া নেবে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এবং সিলেট শহর থেকে সারাদিনের সিএনজি ভাড়া পরবে ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকার মতো। লালা খালে যেতে হলে আপনার আবার ফেরত আসতে হবে জৈন্তাপুর বাজার।


- কাজী মাহদী আমিন

ছবিঃ শায়খুল আলম