বৃহস্পতিবার,২৭ এপ্রিল ২০১৭
হোম / ভ্রমণ / হাইকিং ডেস্টিনেশান: অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে একদিন
০৩/২৩/২০১৭

হাইকিং ডেস্টিনেশান: অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে একদিন

-

বাংলাদেশের হাইকিং ডেস্টিনেশানগুলো মূলত সিলেট এবং চিটাগাং হিল র্ট্যাক্টস অঞ্চলে অবস্থিত। হাইকিং বলতে কিন্তু পাহাড়ে গাড়ি দিয়ে ওঠাকে বলছি না, বলছি পায়ে হেঁটে সমতল থেকে হাজার ফিট ওপরে ওঠার কথা। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর হাইকিং স্পটগুলোতে পৌঁছানোর কোনো সহজ বা ফাঁকিবাজি উপায় নেই। সিলেটের গহিন বনের হামহাম জলপ্রপাত, কিংবা বান্দরবানে অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পর্বত কেওক্রাডং জয় করে অপার্থিব সৌন্দর্যের মুখোমুখি হতে হলে অবশ্যই হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হবে।

হামহাম, শ্রীমঙ্গল

শ্রীমঙ্গলের কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা বনাঞ্চলের ভেতরে, ভারতীয় সীমান্তের পাশে গহিন অরণ্যের মাঝে অবস্থিত হামহাম জলপ্রপাত। সেখানে পৌঁছাতে হলে পিচ্ছিল পাথর, গহিন জঙ্গল, জোঁকের আস্তানা এমনকি বাঁশবাগানও পাড়ি দিতে হবে। প্রথমেই প্রায় আড়াই ঘণ্টা হেঁটে তিনটি টিলা পাড়ি দিতে হবে। তবে সাবধান, উঁচুনিচু পথে আসা-যাওয়ার মাঝে আপনার শরীরে গাছ থেকে জোঁক এসে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যাগ থেকে লবণ বের করে জোঁকের উপর ছিটিয়ে দিলেই জোঁকের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাবেন। টিলা পার করে শুরু হবে গিরিপথ, যা সোজা চলে গিয়েছে হামহাম পর্যন্ত। পানির নিচে অসংখ্য পিচ্ছিল পাথর আছে, আপনার হাতের লাঠি দিয়ে দেখে শুনে চলতে হবে। আশপাশের গাছগুলোতে দেখতে পাবেন আগুনের ফুলকির মতো উজ্জ্বল কিছু ফুল, যার মধ্যে বাসা বেঁধেছে নানা প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপ।

প্রায় ৩.৫ ঘণ্টা হাইক করে, গিরিপথের শেষে পাবেন হামহাম জলপ্রপাত, যার পানি আপনি পান করতে পারবেন সরাসরি। স্বচ্ছ পানির এই ঝরনা ১৬০ ফিট উঁচু এবং বেশ শক্তিশালী। বর্ষাকালে হামহাম হয়ে যায় আরও শক্তিশালী, যার গর্জন গহিন জঙ্গলে শোনা যায় অনেক দূর থেকে। হামহাম থেকে ফেরত আসতে হবে আবার সেই গিরিপথ ধরেই। গাইড ছাড়া হামহাম হাইক করা অসম্ভব, কেননা গহিন বনের রাস্তা স্থানীয়রা ছাড়া কেউ জানে না।

শ্রীমঙ্গল থেকে সারাদিনের সিএনজি কিংবা গাড়ি ভাড়া করতে হবে হামহাম আসা-যাওয়ার জন্য। কমলগঞ্জ উপজেলার শেষ মাথায় গিয়ে শুরু হবে কুরমা বনাঞ্চল, সেখান থেকে হাইকিং শুরু। সকালে শুরু করে বিকালের মধ্যে ফেরত আসা যাবে।

বগা লেক-কেওক্রাডং, বান্দরবান

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত কেওক্রাডং জয় করতে আপনার প্রথমে বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়িতে করে পৌঁছাতে হবে বগা লেকে। বগা লেকের আগেই পেয়ে যাবেন সকল সুযোগ-সুবিধাসংবলিত রুমা জনবসতি। সেখানে আপনি ইলেক্ট্রিক্যাল ডিভাইস চার্জ করে নিতে পারবেন। রুমা থেকেই আপনার গাইড ভাড়া করে নিতে হবে। সেখান থেকে কমলাবাজার পর্যন্ত আপনার চান্দের গাড়ির শেষ সীমানা। এরপরে পথচলা শুরু বগা লেকের উদ্দেশ্যে। ঘণ্টাখানেক পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে এরপর; এরমধ্যে আপনি হাঁপিয়ে যেতে পারেন। চিন্তার কারণ নেই। দলের সঙ্গে সময় নিয়ে মাঝেমধ্যে বিরতি নিন। পথের শেষে চোখে পড়বে বিশাল আকৃতির মনোমুগ্ধকর বগা লেক। লেকের আশপাশে থাকার জায়গা আছে এবং একটি আর্মি ক্যাম্প আছে কিছু দূরে। দিনের আলো কম থাকলে স্থানীয়দের সঙ্গে থাকতে পারেন এক রাত।

বগা লেকের পরে শুরু হবে আপনার মূল হাইক। কেওক্রাডং-এর পথ আরও তিন ঘণ্টার কঠিন হাইক। হাঁটার পথে একপাশে মনে হবে অসীম শূন্যতা, এবং আরেকদিকে বনে ঢাকা পাহাড়। হাতে লাঠি নিয়ে ধীরে-সুস্থে রওনা দেবেন, তাড়াহুড়ো করবেন না। চলার পথে অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করে শেষে পাড়ি জমাবেন মেঘের দেশে। কেওক্রাডং-এর চূড়া থেকে দেখা যায় আরও অনেক উঁচু পাহাড়ের উপরে মেঘ এসে খেলা করছে। এই কষ্টসাধ্য হাইকের উপহার জীবনভর মনে থাকবে আপনার, সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ পর্বত জয় করার গৌরব তো আছেই।

রেমাক্রি লেক, নাফাখুম এবং আমিয়াখুম ঝরনা

বান্দরবানের রেমাক্রি র্ট্যাক কিছুটা সহজ। চান্দের গাড়ি করে নীলগিরি হয়ে আপনার সরাসরি পৌঁছাতে হবে থানচিতে। সেখান থেকে গাইড এবং নৌকা ভাড়া করে তিন্ডু, রাজাপাথরের মতো অসাধারণ সুন্দর জলপথ পার করে যাবেন রেমাক্রি লেকে। সেখানে এক রাত কাটিয়ে পায়ে হেঁটে রওনা দিতে হবে নাফাখুমের উদ্দেশ্যে। পায়ে হেঁটে বেশ গহিন বনের ভেতরে যেতে হয়। প্রথমে আপনি পাবেন অপূর্ব নাফাখুম ঝরনা এবং তারপরে পাবেন স্বর্গের সমতুল্য আমিয়াখুম।

প্রকৃতির সৌন্দর্য, শক্তি এবং তার গর্জন যেন আপনাকে নিয়ে যাবে সৃষ্টির মূলে। চলার পথে পিচ্ছিল পাথর আছে অনেক, তাই সাবধানতা জরুরি। একই পথ ধরে আপনার ফেরত আসতে হবে থানচিতে।

হাইকিং-এর প্রয়োজনীয় সামগ্রী

পানিরোধক ব্যাগ ও ভালো গ্রিপসংবলিত জুতো, পর্যাপ্ত পানি, স্যালাইন, লবণ (জোঁকের জন্য), মশার কয়েল/স্প্রে, প্রয়োজনীয় ফার্স্ট এইড এবং ঔষধ, রোদচশমা, গামছা, টুপি, ভারি মোজা, এক্সট্রা ব্যাটারি, টর্চলাইট, ছুরি, ফিতা, আলগা কাপড়, শুকনো খাবার, লাঠি, স্পঞ্জের স্যান্ডেল, টয়লেট পেপার/টিস্যু।

** যাওয়ার আগে অবশ্যই নিজের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নেবেন এবং শারীরিক কোনো সমস্যা থাকলে হাইকিং করবেন না।

- ফাইজা আমিন

ছবিঃ আফতাব-উজ-জামান খান ও প্রীতম চৌধুরী