বুধবার,২৬ Jul ২০১৭
হোম / খাবার-দাবার / আহা মিষ্টি পান!
০৩/২০/২০১৭

আহা মিষ্টি পান!

-

আমাদের দেশে ঐতিহ্যগতভাবে সামাজিক রীতি, ভদ্রতা এবং আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে পানের ব্যবহার চলে আসছে। বিশেষ করে খাবারের শেষে একটা পান না খেলে যেন পূর্ণতা আসে না। একসময় প্রাচীন সমাজে অভিজাত জনগোষ্ঠীর মাঝে পান তৈরি এবং তা সুন্দরভাবে পানদানিতে সাজিয়ে উপস্থাপন লোকজ শিল্প হিসেবে স্থান পেত।

ঐতিহ্যবাহী ঢাকার সমাজে অধিকাংশ সামাজিক আনুষ্ঠানিকতায় পান অবিচ্ছেদ্য অংশ। পান মূলত যাকে আমরা "বাংলা পান" বলি আর অন্যটি হচ্ছে সাঁচি পান। সাঁচি পান সকলের কাছে পছন্দনীয় কারণ এতে ঝাঁজ কম আরও স্বাদের, কিছুটা সুগন্ধিযুক্ত। অতিথি আপ্যায়ণ আর সামাজিক অনুষ্ঠানে এই পানের একচ্ছত্র ব্যবহার হয়ে থাকে।

পানের বাগানকে বলা হয় বরজ। পানের সাথে সাধারণত তিনটি প্রয়োজনীয় উপকরণ হচ্ছে খয়ের, চুন ও সুপারি যার ব্যবহারে পান খেতে হয় উপাদেয়। পানের ইতিহাস প্রাচীন আর ঢাকার মানুষের জীবনে এর সংশ্লিষ্টতা অনেক। ইতিহাস থেকে জানা যায় যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার সময় সুরমা, পানের বিড়া সাথে নিয়ে যাওয়া হতো।

আমাদের দেশে মানুষ পান বিভিন্নভাবে ও ধরণে খেয়ে থাকে। তন্মধ্যে ঢাকাই খিলিপান বিশেষভাবে উলে­খ্য। ঢাকায় বিবাহ সম্পর্কিত অনুষ্ঠান "পান-চিনি" ও নানা অনুষ্ঠানে পানের সম্পৃক্ততা বলার অপেক্ষা রাখে না। পান সাজানোর ক্ষেত্রে ব্যবহার্য পাত্র "খাশদান", পিকদান, ডাবর এদের সুদৃশ্য নকশা ও অলংকরণ মোঘলদের কৃষ্টির কথাই স্মরণ করায় যেন। সম্ভ্রান্ত বংশের নানা আনুষ্ঠানিকতা, সামাজিক পরিচয় ও ভদ্রতা পানের মাধ্যমেই ফুটে ওঠে। ঢাকায় পান বিক্রেতারা একটা দীর্ঘ সময় অর্থাৎ রাত অবধি পানের দোকান চালাতেন আর অনেক গ্রন্থ থেকে জানা যায় বিংশ শতকের গোড়াতেও এক পয়সায় চার খিলি পান পাওয়া যেত।

বর্তমানে ঢাকাতে পান নতুনভাবে আরও মজাদার উপকরণ ও মশলার সাহায্যে দিনে দিনে জনপ্রিয় হচ্ছে। পানের ব্যবসায়ে অনেকেই এগিয়ে আসছেন আর দোকানের ডেকোরেশনে যোগ হচ্ছে ভিন্নমাত্রা আর অভিজাত্যের ছোঁয়া। ঢাকায় বিয়েসহ নানা অনুষ্ঠান, অফিসিয়াল ও বিভিন্ন ইভেন্টে মিষ্টি পানের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে শাহী পান-এর প্রচলন ঘটেছে ব্যাপকভাবে - নানা সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে।

পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতে বহু জনপ্রিয় পানের দোকান প্রায় মধ্যেরাত পর্যন্ত খোলা থাকে যেখানে মানুষজন রাতের খাবারের পরে এক খিলি পান খেতে আসেন। ওয়ারী কমিউনিটি সেন্টারের সাথে আজাদ পান বিতান, সূত্রাপুরের চীনা পান ঘরসহ লালবাগ, পাটুয়াটুলী, নারিন্দা, কলতাবাজার, মৌশুন্ডি, মিডফোর্ড, নাজিরাবাজার, নাজিমুদ্দিন রোড ইত্যাদি স্থানে রয়েছে অনেক পুরাতন ও জনপ্রিয় পানের দোকান। ১নং সিক্কাটুলিতে অবস্থিত "কাশ্মিরি মিঠা পানে"র স্বত্বাধিকারী বশির আহমেদ জানান তার পিতার হাত ধরেই এই পানের ব্যবসায়ে আসা। সাধারণত উনি সাচি পান দিয়ে তার এই পান তৈরী করে থাকেন যা মহেশখালীতে ও পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে চাষ হয়ে থাকে। সাচি পানের বৈশিষ্ট হচ্ছে এটি হালকা সুগন্ধিযুক্ত আর মুখে মিলিয়ে যায় ও ঝাঁজ খুব কম।

মিষ্টি পানের অধিকাংশ মশলাই আসে পার্শবর্তী দেশ বিশেষ করে ইন্ডিয়া থেকে আর গোলাপের পাপড়ি ও মধুর সংমিশ্রনে তৈরী "গুলকান" এখানেই তৈরী হয়। সুগন্ধি মশলার অনেক উপাদান আসে পাকিস্তান ও কাশ্মির অধ্যুষিত এলাকা থেকে। কাশ্মিরি পান ও নানা ধরণের মিষ্টি পান তৈরিতে জাফরান, গুলকান, পেস্তা, কাজুবাদাম, কিসমিস, খোরমা, নারকেল, ডৰাইফ্রুট, খেজুর, মুম্বাই মাসালা, ফ্রুট জেলি, ধনিয়া, মৌরি, এলাচ, তিল সহ অসংখ্য উপকরণ এমনকি কস্তুরীর ব্যবহারও রয়েছ। হালে জনপ্রিয় হয়েছে "ফায়ার পান" ও "আইস এন্ড ফায়ার" নামে পানের আইটেম দুইটি। এছাড়া দিলি­ জেলি ও বেনারসি মিঠা পান খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে জানা যায়।

মিষ্টি পানের জনপ্রিয়তা এখন সর্বত্র বলে জানান বিভিন্ন শাহী পানের দোকানগুলো। তাই ঢাকার পাঁচতারা হোটেলে নানা অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে অনেক অভিজাত পার্টিতে তাদের বেশ কদর। চাহিদা অনুযায়ী তারা নানা ধরণের মুখরোচক আর মজাদার পানের সরবরাহ করছেন। শাহী পান বা মিষ্টি পানে সাধারণত খয়ের, চুন ব্যবহার হয়না বলে মুখের ভেতর লাল হয়ে যায় না ফলে যারা পান খাননা তারাও নানা অনুষ্ঠানে পরিবেশিত মিষ্টি পান-এর স্বাদ নিয়ে থাকেন।

ঢাকায় আগে থেকেই সাচি পানের কদর ছিল খুব বেশি। জানা যায় ঢাকায় তৎকালীন একটা বাজারের নামই ছিল "সাঁচি পান দরীবাহ" যে এলাকাটি বর্তমানে বাদামতলি এলাকা। সময়ের সাথে অনেক কিছু বদলে গেলেও আমাদের বিশেষ করে ঢাকার সমাজে অতিথি আপ্যায়ণ ও সামাজিক
রীতিনীতিতে এখনো পান বেশ পোক্তভাবেই আসন দখল করে রেখেছে।

লেখা ও ছবিঃ মোহাম্মদ ওয়াসিম
ক্রিয়েটর: Puran Dhakar Khabar