শনিবার,২২ Jul ২০১৭
হোম / ভ্রমণ / মেঘের দেশ, দূর পাহাড়ের সাজেক
০৩/১৪/২০১৭

মেঘের দেশ, দূর পাহাড়ের সাজেক

-

তুমি কেমন আছো ব্যন্ডহু ?
ভাল আছি, আপনি কেমন আছেন?
আমরা ভাল আছি ব্যন্ডহু, তোমরা কি আমাদের পাড়ায় গিয়েছিলে ব্যন্ডহু?
আপনাদের কংলাক পাড়া থেকেই ফিরছি, খুব সুন্দর।
তোমরা সবাই বেড়াতে আসবে ব্যান্ডহু।
অবশ্যই আসব বন্ধু।

ফিরছিলাম কংলাক পাড়া থেকে। পথে দেখা হয়ে গেল চার পাহাড়ির সাথে। পাহাড়ের মানুষজন সাধারনত সমতলের মানুষজনের সাথে যেচে কথা বলেনা। কিন্তু এরা ব্যতিক্রম। কেন ব্যতিক্রম, একটু পরেই বুঝে গিয়েছিলাম। সন্ধের পর এরা একটু পানি পান করে এলোমেলো হয়ে যায়। এলোমেলো হয়েই বন্ধু হয়ে গেছে ব্যান্ডহু!

সন্ধে হবে হবে, এমন সময় পশ্চিম আকাশে গোধুলির রঙের খেলা দেখতে দেখতে হেটে হেটে চলে গেলাম কংলাক পাড়া।পাহাড়ি অনেক পাড়া আমি দেখেছি। সেগুলো থেকে কংলাক পাড়া একটু ভিন্ন রকম, ভৌগলিক কারনে। এক পাশে খাড়া পাথুরে পাহাড়, এরি মাঝে ঝোপঝাড়, বড় বড় গাছ, ওপাশটাকে আড়াল করে রেখেছে। কেউ বলে না দিলে বোঝার উপায় নেই পাহাড়ের ওপারেই এর অবস্থান। আকাবাকা খাড়া পাহাড় বেয়ে পাথুড়ে কাটা কয়েকটা সিড়ি দিয়ে ঢুকে গেলাম পাড়ায়। ছোট্ট একটা মাঠ, একটা দোকান আর কয়েকটা পাহাড়ি ঘর। নাহ, কয়েকটা না, পাহাড় যে চলে গেছে পশ্চিম দিকে, ঐদিকে অনেকগুলো ঘর, পাহাড়ের ঢালেও আছে কিছু। পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে পুব দিকে। পাহাড়ি একজন হাত দিয়ে দেখিয়ে জানাল, ঐযে দুরের পাহাড়টা দেখছেন, ওটাই মিজোরাম, হেটে গেলে দু’দিন লাগে। দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, একবার হেটে যদি চলে যাওয়া যেত!

কংলাক পাড়ার পাথুরে অংশে আছে কয়েকটা স্মৃতি ফলক,সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল বলে ভাল মত নামগুলো পড়া হয়নি। আমি নাম দিয়েছি ‘স্টোন গ্র্যাভ ইয়ার্ড’। নামের কারনেযারা এখনো কংলাক পাড়া যায়নি তাঁদের আকর্ষণ যদি বেড়ে যায় কিঞ্চিৎ!

ভাবছেন কোথায় এই কংলাক পাড়া? বলছি সেটাই। অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি। কোথাও বৃষ্টিতে বাসা থেকে বের হওয়া দায়, আবার কোথাও গরমে। তারপরও বের হতে হবে। অনেক অনেক দিন হয়ে গেল কোথাও বেড়াতে না গিয়ে জমে গেছি। তাই সময় বের করে বেড়িয়ে পরলামনিজমফস্বল শহর থেকে দুরের পাহাড়ে বেড়াতে, সাজেক নামের এক ভ্যালিতে। ভৌগলিকভাবে পরেছে রাঙ্গামাটি,কিন্তু যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। ভারতের মিজোরামের গা ঘেষা এই উপত্যকা খাগড়াছড়ি থেকেও বিচ্ছিন্ন।১৮০০ফুট উচু দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের মাঝে দাড়িয়ে আছে ছিমছাম শান্ত এ ভ্যালী। কংলাক পাড়া এ ভ্যালির শেষ অংশ।

ঢাকা থেকে বাসে করে প্রথমে চলে এসেছিলাম খাগড়াছড়ির দীঘিনালা। দীঘিনালা বাজারের স্থানীয় একটা রেস্টুরেন্টে সেরে নিলাম সকালের নাস্তা। তারপর চড়লাম জীপে যেটাকে স্থানীয়রা বলে চাদের গাড়ি।আগেই বুক করা ছিল। সেই গাড়িতে চড়ে সোজা সাজেক। একদম সোজা চলে গেলাম বলা যাবে না, মাঝে বেশ কয়েকবার বিরতি। পুলিশ আর সেনাবাহিনীর চেকপোস্টগুলোতে থামতেই হবে। সাজেক অনেক দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ভারতের সীমানা ঘেষা, তাই নিরাপত্তার ব্যাপারগুলো সেনাবাহিনীকেই দেখতে হয়। চেকপোস্টগুলোতে চেকের সময়আমরা গাড়িতেই বসে ছিলাম। ড্রাইভার চেকপোস্টগুলোতে গিয়ে জানিয়ে দিল আমাদের পরিচয়। কোথাও তেমন ঝামেলাও হলো না।

তবে সাজেক যাওয়ার পথে একটা বিরতি ছিল প্রকৃতি দর্শন বিরতি। দীঘিনালা থেকে যাত্রা শুরুরমিনিট ত্রিশ পরেই, একটা ঝর্না দেখব বলে। হাজাছড়া ঝর্না। দীঘিনালা থেকে সাজেকের রাস্তায়পরে পাহাড়ি পাড়া শুকনাছড়া। সেখানে গাড়ি থামিয়ে বাম দিকের বুনো পথে নেমে পরলাম। হাটতে হয়েছিলমিনিটপনের। যাওয়ার পথে একটা ঝিরি ঘুরেফিরে আসছিল। সেই ঝিরি ধরেই অল্প ঝোপঝারের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে উকি দিল ঝর্না,হাজাছড়া। ভাগ্য সহায়, ঝর্নায় অনেক পানি। বেশ সুন্দরই লাগলো দেখতে, সময়টা ভালই কাটলো। তারপর আবার যাত্রা শুরু।

পাহাড়ে চাঁদের গাড়ির ছাঁদে চড়ার মজা আলাদা। ডান বাম সব দিকেই তাকিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। আমি ছাদে চড়েই সাজেক গিয়েছি। আকাবাকা সাপের মতো রাস্তার দুপাশে উচু নিচু পাহাড়ের সবুজে তাকিয়ে সময় যে কিভাবে কেটে গিয়েছিল টেরই পাইনি। প্রচন্ড রোদ গায়ে লাগছিল আবার পাগলা বাতাস সেই রোদকে উড়িয়ে দিচ্ছিল। পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখার উপযুক্ত সময় হচ্ছে বর্ষাকাল। বৃষ্টির পর পাহাড়ের রুপ পালটে যায়। সবুজ, আরো সবুজ, গাড় সবুজ যেন চোখের অসুখ সারিয়ে দেয়। সবুজের যে নিজস্ব একটা গন্ধ আছে সেটা টের পেয়েছিলাম এবার। তাইমাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে আমি সবুজের ঘ্রাণ নিচ্ছিলাম। অদ্ভুত সে অনুভুতি।

সাজেক পৌছুতে আড়াই ঘন্টারো বেশি সময়ে নিয়েছিল। রুন্ময় কটেজ আগে থেকে বুক করা ছিল। উঠে গেলাম সেখানে। ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম। পড়ন্ত বিকেলে হ্যালিপ্যাডের আশপাশ ঘুরে হঠাত মনে হল কংলাক পাড়া ঘুরে আসা যাক।

কংলাক পাড়া থেকে ফিরেরুমে শুয়ে ছিলাম, রাতের খাবার খাব একটু পরেই। হঠাত হইচই শুনে বের হয়ে এলাম। মেঘ মেঘ, না, কুয়াশা কুয়াশা! একদল বলছে মেঘ, আরেকদল কুয়াশা।ওদের মতো আমিও ভাবছিলাম,মেঘ না কুয়াশা! উহু, এ সময়ে কুয়াশা আসবে কোথা থেকে? এতো কুয়াশার মতো মেঘ! ঘন কুয়াশার মতো করে মায়ার চাদরে ঢেকে দিচ্ছে পুরো ভ্যালি। দৃষ্টি থামিয়ে দিচ্ছে একটু দুরেই। বৃষ্টির শব্দ কানে আসছে, দূরে কোথাও শুরু হয়ে গেছে। এখনো এদিকটাতে চলে আসেনি। বৃষ্টি এদিকে চলে আসার আগেই কুয়াশার মতো মেঘের মাঝেই হারিয়ে যেতে চাইলাম। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি কনা মিছরির দানার মতোমুখে বুলিয়ে দিল শান্ত পরশ।

সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত,দুটোই দেখার দারুন জায়গা এই সাজেক ভ্যালী। আকাশপানে ছড়িয়ে থাকা পারদ রঙা মেঘে উঠে সূর্য, কিংবা ভোরের রবি হয়ে থাকে ঘন কুয়াশা মেঘের আড়ালে কোন রহস্যমাখা আলোর উৎস। সারাদিন চলে মেঘ আর রোদের খেলা। এই রোদ আর এই বৃষ্টি দেখতে দেখতে এক সময় নিজেই মেঘের মাঝে হারিয়ে যাওয়া। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিকনা পরশ বুলিয়ে দেয় সারা শরীর। মেঘের ভেলা ছুঁয়ে যায় কটেজের বারান্দা। এক সময় সুজ্জি মামা ঢলতে শুরু করে পশ্চিমাকাশে।পানিতে শুকনো লাল রঙ্গ গলে যাওয়ার মতো রাঙ্গা গোধুলিতে সূর্য অস্ত যায় দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের আড়ালে। যদি পূর্ণিমা পেয়ে যায় কেউ, তবে সোনায় সোহাগা। রুপা চাদের সাথেই কাটিয়ে দেয়া যায় সারা রাত।

সময় সুযোগ হলে একবার সাজেক ঘুরে আসাই যায়।

অবস্থানঃ
সাজেক রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার একটি ইউনিয়ন। আয়োতনে এটি নারায়গঞ্জ জেলার চাইতেও বড়, প্রায় ৭০২ বর্গকিলোমিটার। খাগড়াছড়ি থেকে ৭০ আর দীঘিনালা থেকে ৪৯কিমি দূরে। সাজেকের প্রথম গ্রাম রুইলুই পাড়া যার উচ্চতা ১৮০০ ফুট। এর প্রবীণ জনগোষ্ঠী লুসাই। এছাড়া পাংকুয়া ও ত্রিপুরারাও বাস করে। রুইলুই পাড়া থেকে একটু দুরেই সাজেক। সাজেকের বিজিবি ক্যাম্প বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিজিবি ক্যাম্প। এখানে হেলিপ্যাড আছে। সাজেকের শেষ গ্রাম কংলাক পাড়া। এটিও লুসাই জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত পাড়া। কংলাক পাড়া থেকে ভারতের লুসাই পাহাড় দেখা যায়।

কিভাবে যাবেনঃ
ঢাকা থেকে শান্তি পরিবহনে দীঘিনালা, ভাড়া ৬৮০ টাকা। দীঘিনালা খাগড়াছড়ি জেলার একটি উপজেলা। চাইলে ঢাকা থেকে বাসে খাগড়াছড়ি হয়ে সিএনজি কিংবা চাদের গাড়িতেও দীঘিনালা চলে যেতে পারেন। দীঘিনালা থেকে বাইক, সিএনজি, চাদের গাড়ি ভাড়া করে সাজেক। গ্রুপে কতজন থাকবেন, তার উপর নির্ভর করবে বাহন।

দিঘীনালা থেকে সাজেক জীপ রিজার্ভ করে যাওয়া যায়।সাজেকে একরাত্রি থেকে যাওয়াআসা মিলিয়ে পরবে ৭০০০টাকা +। জীপের ড্রাইভার আর এসিস্টান্ট এর খরচ আপনাকেই বহন করতে হবে। সকালে গিয়ে বিকেলে ফিরে আসলে ভাড়া ৫০০০+। দুইতিনজন হলে বাইক/সিএনজি-তে যাওয়া যায়, বাইকে দুজন ৬০০+ শুধু যাওয়ার জন্য। সিএনজি রিজার্ভ ৩০০০+ যাওয়াআসার জন্য। একটি জীপে ১৫ জন যাওয়া যায়। দিঘীনালা থেকে সাজেক যেতে আড়াই ঘন্টার মতো সময় লাগে। যেভাবেই যান, রিজার্ভ করেই যেতে হবে, লোকাল কোন পরিবহণ নেই।

কোথায় থাকবেন
সাজেক ভ্যালি রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন একটা যায়গা।এখানে থাকার যায়গা অনেক সীমিত। তাই রাতে থাকতে চাইলে কোথায় থাকবেনআগে থেকেই ঠিক করে নিতে হবে।

সাজেক রিসোর্ট: এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত রিসোর্ট। চারটি কক্ষ আছে। কতভাড়া সে বেপারে আমার ধারনা নেই। খাবারের ব্যবস্থা আছে বলে শুনেছি। খাগড়াছড়ি সেনানিবাসের গিরি থেবার মাধ্যমে বুকিং দিতে হয়।যোগাযোগ : ০১৮৫৯০২৫৬৯৪।

রুন্ময়: এটি সাজেকে অবস্থিত। এর নীচ তলায় ৩টি কক্ষ আছে, দোতলায় ২টি। ভাড়া পিক/অফ সিজনের উপর নির্ভর করে। আমরা ভাড়া দিয়েছি ৩০০০টাকা করে, প্রতি রুম। ২ বেডের একটি রুমে ৪ জন ছিলাম। অতিরিক্ত ২ জনের জন্য ৪০০ টাকা করে ৮০০টাকা দিতে হয়েছে। যোগাযোগ: ০১৮৬২০১১৮৫২।

আলো রিসোর্ট: এটি সাজেকের একটু আগে রুইলুই পাড়াতে অবস্থিত। ডাবল রুম ৪ টি (২বেড), যার প্রতিটির ভাড়া ১০০০ টাকা। সিংগেল রুম ২ টি, প্রতিটির ভাড়া ৭০০ টাকা। যোগাযোগ : পলাশ চাকমা -০১৮৬৩৬০৬৯০৬।

রুইলুই পাড়া ক্লাব হাউজ: এটিও রুইলুই পাড়াতে অবস্থিত। এখানে ১৫ জনের মত থাকতে পারবেন। ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা করে দিতে হবে। যোগাযোগ: মইয়া লুসাই - ০১৮৩৮৪৯৭৬১২।

# জেনে রাখা ভাল, সাজেকে রবি এবং টেলিটক ছাড়া আর কোন মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, রবি অপেক্ষাকৃত ভালো।আর প্রাইভেট কার নিয়েও সাজেক যাওয়া যায়।

- মশহ শিহাব